মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাহান্নামিদের তিন বৈশিষ্ট্য

অনলাইন ডেস্ক »

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের ইবাদতের পাশাপাশি তাদের অন্তরের অবস্থা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঠিক থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বিশ্বনবী (সা.) বিভিন্ন হাদিসে জান্নাতি ও জাহান্নামিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, যাতে মানুষ আমলের পাশাপাশি নিজের চরিত্রকে যাচাই করে সংশোধনের সুযোগ পায়।

তেমনই একটি হাদিস, হারিসাহ ইবনে ওয়াহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদের জান্নাতি লোকদের সম্পর্কে জানাব না? তারা হবে (দুনিয়াতে) দুর্বল, মজলুম। তারা যদি আল্লাহর ওপর কসম করে, তবে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। আর জাহান্নামের অধিবাসী হবে অবাধ্য, ঝগড়াটে ও অহংকারীরা।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৬৫৭)
এই হাদিসে মহানবী (সা.) জাহান্নামিদের তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন।

প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো ‘উতুল’ হওয়া। এর অর্থ রূঢ়, কর্কশ ও নির্মম স্বভাবের মানুষ। এ ধরনের ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ করতে পারে না। তার হৃদয় দয়ার পরিবর্তে কঠোরতায় পূর্ণ থাকে।

সে অন্যের কষ্ট অনুভব করে না, ক্ষমা করতে জানে না এবং সব সময় কঠিন ও রূঢ় আচরণ করে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো কোমলতা ও দয়ার শিক্ষা। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) নিজেও অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও নম্র ছিলেন।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো ‘জাওয়ায’। এ শব্দের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

কেউ বলেছেন, এটি এমন ব্যক্তি যে সম্পদ জমা করে, কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত হক আদায় করে না। আবার শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে অত্যন্ত অধৈর্য ও অস্থির। সামান্য বিপদেই সে ভেঙে পড়ে, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট হয় এবং তাকদিরের ওপর আপত্তি করতে থাকে। তার জীবন অভিযোগ, হতাশা ও অস্থিরতায় পরিপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এক যুদ্ধে একজন ব্যক্তি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছিলেন। তাঁর বীরত্ব দেখে সবাই মুগ্ধ হলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘সে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।’ পরে দেখা গেল, যুদ্ধে আহত হওয়ার পর তিনি ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না এবং আত্মহত্যা করলেন। তখন নবী (সা.) বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতিদের মতো আমল করতে থাকে, অথচ সে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’ এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে বাহ্যিক কর্মের পাশাপাশি অন্তরের দৃঢ়তা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (বুখারি, হাদিস : ২৮৯৮)

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো অহংকার। অহংকার এমন একটি রোগ, যা মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ অহংকারী ব্যক্তি মনে করে, সে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ফলে সে সত্যের সামনে নত হয় না এবং মানুষের প্রতি দয়া ও সম্মান প্রদর্শন করে না। এই অহংকারই একসময় ইবলিসকে ধ্বংস করেছিল। সে আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল শুধু অহংকারের কারণে। তাই অহংকার শুধু একটি খারাপ স্বভাব নয়; এটি মানুষের ঈমান ও আমলকে ধ্বংস করার মতো মারাত্মক ব্যাধি।

অতএব, এই হাদিস আমাদের সামনে চরিত্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড উপস্থাপন করে। কঠোরতা, অধৈর্যতা ও অহংকার মানুষকে জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়; আর বিনয়, ধৈর্য ও কোমলতা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া, বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জাহান্নামিদের বৈশিষ্ট্য থেকে হেফাজত করুন এবং জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

আপনার মন্তব্যটি লিখুন
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »