লিফট এখন আধুনিক নগরজীবনের অপরিহার্য অংশ। বহুতল আবাসিক ভবন, অফিস, হাসপাতাল, শপিংমল কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ লিফট ব্যবহার করছেন। কিন্তু একটি লিফট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে কিংবা ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় চালানো হলে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বড় দুর্ঘটনার কারণ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে লিফট দুর্ঘটনার খবর সামনে আসায় লিফটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার পেছনে থাকে যান্ত্রিক ত্রুটি, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো যন্ত্রাংশ কিংবা নিরাপত্তা নিয়ম না মানার মতো বিষয়।
তাহলে লিফট দুর্ঘটনা আসলে কেন ঘটে?
১. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
লিফট একটি যন্ত্রনির্ভর ব্যবস্থা। এর বিভিন্ন অংশ নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ভবনে লিফট স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।
দীর্ঘদিন সার্ভিসিং না হলে ব্রেক, দরজার মেকানিজম, রোপ, পুলি, কন্ট্রোল সিস্টেমসহ বিভিন্ন অংশে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সময়মতো ত্রুটি শনাক্ত না হলে ছোট সমস্যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
২. ত্রুটিপূর্ণ লিফট চালু রাখা
কোনো লিফটে বারবার সমস্যা দেখা দেওয়ার পরও অনেক সময় সাময়িক মেরামত করে সেটি আবার চালু করা হয়।
যেমন—লিফট বারবার আটকে যাচ্ছে, অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে বা দরজা ঠিকমতো কাজ করছে না। এসব সমস্যার মূল কারণ খুঁজে সমাধান না করে শুধু সাময়িকভাবে সচল করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ত্রুটিপূর্ণ লিফটের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করা জরুরি।
৩. ব্রেক সিস্টেমে ত্রুটি
লিফটের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্রেক সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিফট নির্দিষ্ট জায়গায় থামানো এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে ব্রেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্রেক সিস্টেমে ত্রুটি থাকলে লিফটের চলাচলে অস্বাভাবিকতা তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিদর্শনের সময় ব্রেক ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৪. লিফটের রোপ বা অন্যান্য যান্ত্রিক অংশের সমস্যা
লিফটের বিভিন্ন যান্ত্রিক অংশ দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। রোপ, পুলি, বিয়ারিং, গাইড রেলসহ বিভিন্ন অংশের নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা প্রয়োজন।
কোনো অংশে ক্ষয়, ফাটল বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হয়।
৫. দরজার সেন্সর ও ইন্টারলক সমস্যা
লিফটের দরজা নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলে লিফট চলাচল না করার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে।
দরজার সেন্সর বা ইন্টারলকে সমস্যা হলে লিফটের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। তাই লিফটের দরজা বারবার আটকে গেলে বা অস্বাভাবিকভাবে খুললে-বন্ধ হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
৬. অতিরিক্ত ওজন বা ওভারলোড
প্রতিটি লিফটের নির্দিষ্ট ওজন বহনের ক্ষমতা রয়েছে। নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বা মালামাল উঠলে লিফটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই লিফটে দেওয়া সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওভারলোড অ্যালার্ম বাজলে কখনোই সেটি উপেক্ষা করা উচিত নয়।
৭. নিম্নমানের বা অনুপযুক্ত যন্ত্রাংশ ব্যবহার
লিফটের গুরুত্বপূর্ণ কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে সেটি পরিবর্তনের সময় উপযুক্ত মানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা জরুরি।
কম মানের, ভুল স্পেসিফিকেশনের কিংবা অনুপযুক্ত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করলে লিফটের নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৮. দক্ষ প্রকৌশলী বা প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ছাড়া মেরামত
লিফটের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা জটিল। তাই যেকোনো ধরনের মেরামত বা সমন্বয়ের কাজ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে করা প্রয়োজন।
অভিজ্ঞতা বা প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়া লিফটের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ করলে ত্রুটি আরও বাড়তে পারে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৯. নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা না করা
শুধু লিফট চলছে কি না—এটিই নিরাপত্তার একমাত্র মাপকাঠি নয়। লিফট স্বাভাবিকভাবে চললেও এর বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যেমন—
জরুরি ব্রেক ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা
দরজার ইন্টারলক
সেন্সর
অ্যালার্ম
জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা
কন্ট্রোল সিস্টেম
রোপ ও অন্যান্য যান্ত্রিক অংশ
নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ত্রুটি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।
১০. বিদ্যুৎ ও কন্ট্রোল সিস্টেমের সমস্যা
লিফটের পরিচালনায় বৈদ্যুতিক ও কন্ট্রোল সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোল্টেজের সমস্যা, বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি কিংবা কন্ট্রোল সিস্টেমে সমস্যা হলে লিফটের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
লিফট বারবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে, অস্বাভাবিকভাবে থামলে বা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
১১. পুরোনো লিফটের আধুনিকায়ন না করা
অনেক বছর ধরে ব্যবহৃত লিফটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যেতে পারে। পুরোনো লিফটের ক্ষেত্রে শুধু নিয়মিত মেরামত নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী মডার্নাইজেশন বা আধুনিকায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
লিফটের বয়স, ব্যবহার, যন্ত্রাংশের অবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
১২. ব্যবহারকারীর অসতর্কতা
লিফট দুর্ঘটনার সব কারণ যান্ত্রিক নয়। ব্যবহারকারীর অসতর্কতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যেমন—
ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী ওঠা
দরজা জোর করে খোলা
লিফট চলার সময় লাফালাফি করা
দরজায় হেলান দেওয়া
শিশুদের একা লিফটে উঠতে দেওয়া
লিফট আটকে গেলে নিজেরাই দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করা
এসব আচরণ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
১৩. ভবনের কর্তৃপক্ষের অবহেলা
লিফটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভবন মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিফটে সমস্যা দেখা দেওয়ার পরও যদি তা ব্যবহার বন্ধ না করা হয়, কিংবা বাসিন্দাদের অভিযোগের পরও প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশেষ করে কোনো লিফটে বারবার একই সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
১৪. জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি
একটি লিফটে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
জরুরি অ্যালার্ম, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সচল না থাকলে বিপদের সময় যাত্রীরা আরও সমস্যায় পড়তে পারেন।
লিফট দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী করা দরকার?
লিফট দুর্ঘটনা কমাতে শুধু যাত্রীদের সতর্ক হলেই হবে না। ভবন কর্তৃপক্ষ, লিফট মালিক, রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবহারকারী—সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
প্রথমত, লিফটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে পুরোনো বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ লিফটের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন করতে হবে এবং মেরামতের কাজ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান বা প্রকৌশলীর মাধ্যমে করাতে হবে।
শেষ কথা
লিফট দুর্ঘটনা সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। অনেক সময় ছোট একটি ত্রুটি দীর্ঘদিন অবহেলার কারণে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়। অস্বাভাবিক শব্দ, ঝাঁকুনি, দরজার সমস্যা কিংবা বারবার আটকে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো তাই কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।
নিরাপদ লিফটের জন্য প্রয়োজন—নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সময়মতো ত্রুটি শনাক্তকরণ, মানসম্মত যন্ত্রাংশ, দক্ষ কারিগরি সেবা এবং সচেতন ব্যবহার।
একটি লিফট ঠিকমতো চলছে—এটাই তার নিরাপদ হওয়ার প্রমাণ নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা ও দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণ।