বুধবার, ২২ মে ২০২৪ । ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী, আমদানি কমাতে শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পনা

অনলাইন ডেস্ক »

দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং আমদানি বিল কমাতে- কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়াতে চায় সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাতের মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আসন্ন জাতীয় বাজেটে ফ্রিজ, ফ্যান, এলপিজি সিলিন্ডার, লিফট ও এসকেলেটরের মতো বিবিধ পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত আমদানি শুল্ক বাড়তে পারে। এছাড়া, কেবলমাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হয় এমন মূলধনী যন্ত্রপাতির তালিকা থেকে এসকেলেটর আমদানিকে বাদ দিতে চায় সরকার।

স্থানীয় শিল্পগুলোকে আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেওয়া প্রস্তাবিত এসব ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।

স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে উচ্চ আমদানি শুল্ক

উচ্চতর আমদানি শুল্ক আরোপ করে, সরকার দেশজ উৎপাদন ও প্রস্তুতকারক খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত দিতে চায়; যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। এতে করে, আমদানির পেছনে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হতো, তাও সাশ্রয় হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।

এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় স্থানীয় শিল্পকে আরো দক্ষ করে তোলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের খসড়া বাজেটের এসব প্রস্তাবনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে আলোচনা হয়। এরপর গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। আগামী ১ জুন সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, এরপর তা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা পরিকল্পনার বিষয়ে আশাবাদী

কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়ানোর সরকারি পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, এতে এসব খাতে তাদের বিনিয়োগ আরো বাড়বে; যা আরো কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করবে।

একইসঙ্গে, তারা এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার লক্ষ্যে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রচেষ্টা দৃঢ় করতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, ইতোমধ্যেই স্থানীয় কিছু উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্য রপ্তানিতে সাফল্যও পেয়েছেন।

ফ্যান প্রস্তুতকারকরা উচ্ছ্বসিত

সংশ্লিষ্ট শিল্পের সূত্রগুলো জানায়, দেশে ফ্যান বা বৈদ্যুতিক পাখার বাজার চাহিদা প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার।

এখাতের বড় প্রস্তুতকারকদের মধ্যে রয়েছে বিআরবি গ্রুপ, আরএফএল গ্রুপ, ওয়াল্টন গ্রুপ, যমুনা, সুপারস্টার, এনার্জিপ্যাক ও এসকিউ গ্রুপের মতো বৃহৎ সংস্থা। এরপরও ১২৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে চীন, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে কিছু ব্যবসায়ী ফ্যান আমদানি করেন।

সে তুলনায়, ফ্যান উৎপাদনে দরকারি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৬ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের।

বাড়ছে লিফট ও এসকেলেটরের চাহিদা

শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশে লিফট ও এসকেলেটরের বার্ষিক চাহিদা ৪,৫০০ ইউনিট; আর বর্তমানে আমদানি শুল্ক দিতে হয় ১৫.২৫ শতাংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয় বাজার চাহিদা বিবেচনা করে, দেশের বেশ কিছু কোম্পানি লিফট ও এসকেলেটর উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। সরকারও তাদের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি হারসহ নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। তবে, লিফট এবং স্কিপ হোয়েস্টের জন্য আমদানি শুল্ক মাত্র ৫ শতাংশ।

এই বাস্তবতায়, ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগ আরো উৎসাহিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লিফট এবং এসকেলেটরের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

এনবিআর রেয়াতি হারে কাঁচামাল আমদানির গ্যাজেট প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে মূলধনী যন্ত্রপাতির শ্রেণিভুক্ত না হওয়ায় – এই তালিকা থেকে বাদ পড়বে এসকেলেটর।

উদ্যোক্তারা জানান, তারা বর্তমানে লিফট এবং এসকেলেটর উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ৬ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দেন।

১০ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বাজার সম্ভাবনা দেখছে ইলেকট্রনিক্স খাত

খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, ২০২০ সালে দেশে প্রায় ২৬ লাখ রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয়েছে। এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছে দেশের বড় বড় ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলো।

মার্কেটিং ওয়াচ বাংলাদেশ (এমডব্লিউবি) – এর গবেষণা অনুযায়ী, দেশের রেফ্রিজারেটর বাজার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে, মাত্র দুই বছরেই ১৩১ মিলিয়ন ডলার থেকে যা ৫৪৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

ফ্রিজ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ৬ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। সে তুলনায়, ফ্রিজ আমদানিতে ১২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।

নীতি-সহায়তার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা-প্রকাশ করেন ওয়ালটন ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্স অ্যান্ড লিফট -এর ব্র্যান্ড ম্যানেজার জাকিবুর রহমান সেজান। এই সহায়তার ফলেই ওয়ালটন দেশের সবচেয়ে বড় ফ্রিজ প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেজান বলেন, বর্তমানে আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ এশিয়া, আফ্রিকার আরও ৪০টি দেশে ফ্রিজ, টিভি ও অন্যান্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স রপ্তানি করছি।

বিক্রয়-পরবর্তী সেবা ও পণ্যের মানের কারণে স্থানীয় বাজার থেকে তারা দারুণ সাড়া পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দেশে ফ্যান ও ফ্রিজের যে বার্ষিক চাহিদা, স্থানীয় শিল্পের তা পূরণের সক্ষমতা রয়েছে। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে। এতে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ে তারা কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, আগে লিফট ও এসকেলেটর খাত ব্যাপকভাবে আমদানি নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু, এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে বড় দুটি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে।

কামাল আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত শুল্ক ব্যবস্থা আরও উদ্যোক্তাকে আকৃষ্ট করে এ খাতকে উদীয়মান বিনিয়োগের সুযোগে পরিণত করবে।

নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগ শিল্প প্রতিষ্ঠান- ইউসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রক্ষেপণ অনুসারে, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিনসহ অন্যান্য হোম অ্যাপ্লায়েন্সের স্থানীয় বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। যা এই শিল্পের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকেই তুলে ধরছে।

সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলপিজি সিলিন্ডার প্রস্তুতকারকরাও

বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের বিভাগীয় প্রধান (বিক্রয়) জাকারিয়া জালাল সরকারের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রণোদিত করার পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, এই শিল্পে বছরে ২০ লাখ নতুন সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। তাই প্রায় সব এলপি গ্যাস কোম্পানি সিলিন্ডার উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। তাদের মোট বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ লাখ সিলিন্ডার।

আমদানিকৃত সফটওয়্যারও করের আওতায় আসবে

২০২৩-২৪ অর্থবছরের খসড়া বাজেটে সফটওয়্যার আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ, ইনোভেশন, ইনকিউবেশন অ্যান্ড কমার্শিয়ালাইজেশন (আইআরআইআইসি) এর পরিচালক অধ্যাপক ডক্টর খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এই শুল্ক আরোপ স্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি-মেধাবী স্থানীয় জনশক্তির আরো চাকরি তৈরির সহায়ক হবে। অন্যদিকে, আমদানিকৃত সফটওয়্যার থেকে সরকারও কিছু রাজস্ব পাবে।

অন্যান্য তৈরি পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হলে – স্থানীয় শিল্প আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক দামে সেগুলো সরবরাহ করতে পারবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আপনার মন্তব্যটি লিখুন
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »